০৭:০৯ পি.এম
বর্তমান সময় এমন একটি অস্থিরতার ভেতর দিয়ে যাচ্ছে, যেখানে সত্য এবং মিথ্যার ভেদ অনেকের কাছে আর বোঝা যাচ্ছে না। মানুষের বিশ্বাস, নৈতিকতা এবং চরিত্র নিয়ে বিভিন্ন ধরনের ফিতনা, বিভ্রান্তি, সন্দেহ, অপসংস্কৃতি, ভুল মতবাদ, সামাজিক অস্থিরতা মাথা বাড়িয়ে উঠেছে। অনেকেই এই সময়কে ফিতনার যুগ বলে চিহ্নিত করছেন।
কারণ, মানুষের ঈমান, পারিবারিক বন্ধন, সামাজিক শৃঙ্খলা, ধর্মীয় পরিচয় সমস্ত কিছু আজ বিভিন্ন পরীক্ষার সম্মুখীন। ফিতনার সবচেয়ে ভয়াবহ দিক হল, এটি নিঃশব্দে, ধীরে ধীরে এবং অজান্তেই হৃদয়ে প্রবেশ করে। কখনো শয়তানের ক্ষীণ কুমন্ত্রণায়, কখনো দুনিয়ার ঝলকে, আবার কখনও মন্দ সঙ্গ ও পরিবেশের মাধ্যমে।
ফিতনার ক্ষতি অনেক সময় মানুষ টের পায় না, কিন্তু এর প্রভাব গভীর এবং বিধ্বংসী হয়ে ওঠে। এই ভয়াবহ পরিস্থিতিতে একজন মুমিনের সবচেয়ে বড় আস্থা ও আশ্রয় হল দৃঢ় ঈমান। শক্তিশালী ঈমান, যা অন্ধকার ফিতনার মাঝেও পথ দেখাতে পারে এবং শয়তানের আঘাত প্রতিহত করতে সক্ষম। এটি দুনিয়ার বাড়াবাড়ি এবং গোমরাহি থেকে রক্ষা করে। কোরআন ও হাদিস অত্যন্ত স্পষ্টভাবে নির্দেশনা দিয়েছে, ফিতনা থেকে মুক্তির একমাত্র উপায় হল ঈমানকে মজবুত করা এবং আল্লাহর দড়ি আঁকড়ে ধরা।
আরও পড়ুন: সেন্টমার্টিনে জাহাজ চলাচল শুরু, প্রথম দিনে ১১৭৪ জন পর্যটক পৌঁছেছেন
ফিতনার যুগে ঈমানের গুরুত্ব অপরিসীম। ফিতনা মানুষের জীবনের পরীক্ষা হিসেবে আবির্ভূত হয়। আল্লাহ বলেন, أَنَّ اللَّهَ يَحُولُ بَيْنَ الْمَرْءِ وَقَلْبِهِ। এই আয়াত জানিয়ে দেয়, মানুষের ঈমানকে টিকিয়ে রাখতে আল্লাহর সাহায্য ছাড়া কিছুই সম্ভব নয়। তাই ফিতনা থেকে বাঁচার জন্য ঈমানই প্রথম অস্ত্র।
ফিতনা অত্যন্ত ধ্বংসাত্মক, আর সুরক্ষার একমাত্র উপায় হল দৃঢ় ঈমান। সুরা আনফাল :২৫-এ বলা হয়েছে, তোমরা এমন ফিতনা থেকে সাবধান হও, যা শুধু জালিমদেরই গ্রাস করবে না। এই আয়াত সতর্ক করে দেয়, ফিতনা শুধু পাপীদের নয়; এটি পুরো সমাজকেই গ্রাস করে। ফলে শক্তিশালী ঈমান ছাড়া ফিতনা থেকে মুক্তি অসম্ভব।
দৃঢ় ঈমান সঠিক পথে রাখে। সুরা নিসা:১৩৬-এ বলা হয়েছে, হে ঈমানদাররা! তোমরা আল্লাহ ও তাঁর রসুলের প্রতি দৃঢ়ভাবে ঈমান রাখো। এই আয়াত প্রমাণ করে, ঈমানের উন্নতি একটি ধারাবাহিক প্রক্রিয়া। যতো বেশি ঈমান শক্তিশালী হবে, ফিতনার ঝড় ততো সহজে সামলানো যাবে।
ফিতনার আগমন এবং আশ্রয় নিয়ে রসুল সল্লাল্লাহু আলাই ওয়া সাল্লাম বলেছেন, সَتَكُونُ فِتَنٌ، الْقَاعِدُ فِيهَا خَيْرٌ مِنَ الْقَائِمِ। তখন ফিতনা আসবে। বসা ব্যক্তি থাকা দাঁড়ানোর চাইতে বেশি কল্যাণকর হবে। এর ফলে ফিতনার যুগে হঠাৎ সিদ্ধান্ত নেওয়ার বদলে ঈমানকে শক্তিশালী করে সঠিক সিদ্ধান্ত নেওয়া জরুরি।
আরও পড়ুন: টঙ্গীতে জোড় ইজতেমায় একটি মুসল্লির মৃত্যু
ঈমান যদি শক্ত না হয় তবে হৃদয় কালো হয়ে যায়। রসুল সল্লাল্লাহু আলাই ওয়া সাল্লাম বলেছেন, تُعْرَضُ الْفِتَنُ عَلَى الْقُلُوبِ عَرْضًا عَرْضًا। ফিতনা একের পর এক হৃদয়ে প্রবেশ করবে; যিনি গ্রহণ করবেন, তার হৃদয়ে কালো দাগ পড়বে। এর মানে, দুর্বল ঈমানের হৃদয় সহজেই ফিতনার শিকার হয়।
আল্লাহর দিকে ফিরলে ফিতনা থেকে রক্ষা পাওয়া যায়। রসুল সল্লাল্লাহু আলাই ওয়া সাল্লাম সবসময় এই দোয়া করতেন, يَا مُقَلِّبَ الْقُلُوبِ ثَبِّتْ قَلْبِي عَلَى دِينِكَ। এ দোয়া প্রতিস্থাপন করে, ঈমানের দৃঢ়তা ছাড়া ফিতনা প্রতিরোধ করা সম্ভব নয়।
ফিতনা থেকে মুক্তির উপায়গুলো:
১. আল্লাহর জিকিরে দৃঢ় থাকা। সুরা রদ:২৮-এ বলা হয়েছে, নিশ্চয় আল্লাহর জিকিরেই হৃদয় প্রশান্তি লাভ করে।
আরও পড়ুন: নবীজির নবুওয়াত লাভের আগে জাহেলি রীতি ও শিরকের প্রতি ঘৃণা
২. নিয়মিত কোরআন তিলাওয়াত ও বুঝে পড়া। রসুল বলেছেন, إِنَّ هَذَا الْقُرْآنَ هُوَ حَبْلُ اللَّهِ।
৩. সালাত প্রতিষ্ঠা করা। আল্লাহ বলেছেন, إنَّ الصَّلَاةَ تَنْهَىٰ عَنِ الْفَحْشَاءِ وَالْمُنكَرِ।
৪. নিজের আকিদা ঠিক করা। রসুল বলেছেন, سَتَكُونُ فِتَنٌ... قَالُوا فَمَا الْمَخْرَجُ مِنْهَا؟
৫. ভালো সঙ্গ গ্রহণ করা। রসুল বলেছেন, الْمَرْءُ عَلَى دِينِ خَلِيلِهِ।
আরও পড়ুন: শায়খুল হাদিস মাওলানা আব্দুল কুদ্দুস কাসেমীর জানাজায় লাখো মানুষের সমাগম
৬. হাসাদ, রাগ, গিবত, এই অভ্যন্তরীণ ফিতনাগুলো থেকে বাঁচা।
ফিতনার যুগে বাঁচার জন্য বাহ্যিক পদক্ষেপ যতই নেওয়া হোক, মূল সুরক্ষা হল শক্ত, সুসংহত ও পরিশুদ্ধ ঈমান। দৃঢ় ঈমান একমাত্র আলো যা অন্ধকার ফিতনার মাঝে পথ দেখায়; যা শয়তানের ধোঁকা প্রতিহত করে; যা দুনিয়ার অস্থিরতার মধ্যে আল্লাহর দিকে রাখে। কোরআন এবং হাদিসের নির্দেশনা হল: ঈমানকে দৃঢ় করো, তাহলেই ফিতনা তোমাকে ভেঙে ফেলতে পারবে না।
ডেইলি দি ক্রাইম/মিডিয়া লিঃ
সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন