০৯:১৫ পি.এম
সম্প্রতি বিভিন্ন সূত্রের খবরে জানা গেছে, পাকিস্তান ইরানকে এমন ইঙ্গিত দিয়েছে যে, ইরান যদি ইসরাইল আমেরিকার বিরুদ্ধে চলমান যুদ্ধের অংশ হিসেবে সৌদি আরবে হামলা করে তাহলে পাকিস্তান ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধে জড়িয়ে পড়তে পারে। এমন কথা সত্যিই যদি পাকিস্তানের পক্ষ থেকে বলা হয়ে থাকে তাহলে তা শুধু তাদেরকে মুসলিম বিশ্বের কাছে মধ্যপ্রাচ্যের নামধারী মুসলিম রাষ্ট্র গুলোর মত অবিশ্বাসী করে তুলবে না বরং নিজেদের সামরিক সক্ষমতা ও পরমাণু শক্তিধর রাষ্ট্র হিসেবে টিকে থাকার ক্ষেত্রেও মারাত্মক আশঙ্কা তৈরি করতে পারে। সেই সাথে মধ্যপ্রাচ্যে বিশ্বের অপর দুই পরাশক্তিধর রাষ্ট্র রাশিয়া ও চীনের যেহেতু অর্থনৈতিক রাজনৈতিক ও ভূকৌশল গত গুরুত্বপূর্ণ স্বার্থ রয়েছে, সে কারণে পাকিস্তান তাদের শত্রু তালিকায় গিয়ে দক্ষিণ এশিয়ায় নিজেদের যে শক্তিশালী অবস্থান তৈরি করেছিল, তা তাসের ঘরের মতো ভেঙে পড়তে পারে কিংবা এক ঘরে হয়েও পড়তে পারে যা তার বন্ধু রাষ্ট্রগুলোর জন্য হবে অত্যন্ত বেদনাদায়ক।
এটি আর কিছুই নয়, মুসলিম বিশ্বের একমাত্র পরমাণু শক্তিধর রাষ্ট্র যাকে ধ্বংসের জন্য ইসরাইল এবং যুক্তরাষ্ট্র দীর্ঘদিন থেকেই চেষ্টা করে যাচ্ছে সেই সাথে তার চিরশত্রু, প্রতিদ্বন্দ্বী ভারতও চেষ্টা করে যাচ্ছে, পাকিস্তান কর্তৃক সৌদি জোটের হয়ে ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধের ঘোষণা কিংবা সম্ভাবনা পাকিস্তান বিরোধী শক্তি কিংবা তাদের মেঘ না চাইতে পাকিস্তান বৃষ্টি দেওয়ার পরিকল্পনাই মনে হবে। যেখানে ভারতের সাথে ইসরাইলের বন্ধুত্ব প্রকাশ্যে বিশ্বের অন্যতম বন্ধুত্বের পরিচায়ক। এমনকি ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী এর মধ্যে ঘোষণাও দিয়েছেন যে, ভারতের মত একটি রাষ্ট্র ও জনগণ আমাদেরকে বিশ্বের সব রাষ্ট্রের চেয়ে বেশি ভালোবাসে।
আরও পড়ুন: মেক্সিকোতে ৭.৪ মাত্রার শক্তিশালী ভূমিকম্প, সুনামি সতর্কতা জারি করা হলো
সুতরাং পাকিস্তানকে মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধে জড়িয়ে পড়া সম্পর্কে যতটা চিন্তা না করা উচিত, তার চেয়ে রাষ্ট্রটির রীতি নির্ধারকদের আরো বেশি বিশ্লেষণ করা উচিত, পশ্চিমা বিশ্বের প্ররোচনায় নিজের দেশের সাথে অপর মুসলিম দেশ আফগানিস্তানের সীমান্তে দা-কুমড়া সম্পর্ক তৈরি করা, ভারতের সাথে চিরশত্রু তথা সাপে-নেউলে সম্পর্ক এবং ইজরায়েল আমেরিকা কর্তৃক একমাত্র মুসলিম রাষ্ট্র হিসেবে পরমাণু শক্তিধর হওয়ায় এশিয়ার এই পরাশক্তি রাষ্ট্রটিকে যেকোনো যুদ্ধে জড়িয়ে তার অক্ষমতা তৈরি কিংবা সামরিক সক্ষমতা ধ্বংসের মাধ্যমে কমিয়ে ফেলার দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা - এটা এই মুহূর্তে পাকিস্তানের নীতি নির্ধারকদের বোঝা অত্যন্ত জরুরী।
পাকিস্তানের এটাও অনুধাবন করা উচিত, বর্তমান ইহুদিবাদী ইসরাইল - আমেরিকা ও ইরান যুদ্ধে সৌদি আরব শুধু নয়, মধ্যপ্রাচ্যে মুসলিম নামধারী রাষ্ট্রগুলোতে থাকা মার্কিন সামরিক ঘাঁটি কিংবা ইজরাইল-আমেরিকা সমর্থিত মুসলিম বিদ্বেষী কিংবা ইরান বিদ্বেষী রাষ্ট্রগুলোর বিরুদ্ধে ইরান যুদ্ধ করছে না কিংবা এসব রাষ্ট্রের মুসলিম জনগণের বিরুদ্ধেও যুদ্ধ করছে না, কিংবা সেই রাষ্ট্রগুলোতে ইসরাইল কিংবা আমেরিকার মতো যুদ্ধনীতি পরিপন্থী কোন বেসামরিক স্থাপনায় এখন পর্যন্ত কোন হামলাও ইরান পরিচালনা করেনি। তবে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র যেভাবে ইরানের বেসামরিক স্থাপনা ও সেতুগুলোতে এমনকি হাসপাতালের কাছাকাছি হামলা চালিয়েছে তাতে ইরান বসে থাকবে এমনটা ভাবার কোন অবকাশ নেই। এবং ইরান ওইসব রাষ্ট্রের জনগণকে বলেও দিয়েছে যে, প্রতিবেশী মুসলিম রাষ্ট্রগুলোর জনগণ আমাদের ভাই, আমরা তাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করছি না, যুদ্ধ করছি তাদের রাষ্ট্রে থাকা মুসলিমদের শত্রু, মধ্যপ্রাচ্যে আধিপত্য বিস্তার করা এবং মুসলিমদের ধ্বংস করা শক্তির বিরুদ্ধে এবং তাদের স্থাপনা ও ঘাঁটির বিরুদ্ধে হামলা চালানো হচ্ছে।
অর্থাৎ ইরান ঐ সব দেশের মার্কিন স্বার্থসংশ্লিষ্ট ঘাঁটি ও স্থাপনায় হামলা চালাচ্ছে যেখান থেকে ইরানের বিরুদ্ধে ক্রমাগত যুদ্ধের নিয়ম নীতির তোয়াক্কা না করে সামরিক বেসামরিক স্থাপনা রেল সেতু সড়ক সেতু এমনকি স্কুল কলেজ হাসপাতাল সহ সকল বেসামরিক স্থাপনায় মার্কিন যুক্তরাষ্ট হামলা চালিয়ে যাচ্ছে। পাকিস্তানকে এও বোঝা উচিত, ঐসব রাষ্ট্রের সামরিক ঘাঁটি ব্যবহার করে ইরানের বিরুদ্ধে হামলা পরিচালনা করা হচ্ছে আরেক মুসলিম দেশ ইরানের বিরুদ্ধে।
অন্যদিকে ইরান-পাকিস্তান পারস্পরিক প্রতিবেশী এবং দুটি-ই মুসলিম রাষ্ট্র, যারা বিশাল সীমান্ত পরিবেষ্টিত। তাদের স্বার্থ এক হওয়া মুসলিম হিসেবে বর্তমান পরিস্থিতিতে অত্যন্ত জরুরী। বিশেষ করে পশ্চিমা শক্তি তথা ইহুদীবাদী শক্তি আমেরিকা ও ইসরাইলের বিরুদ্ধে এক্ষেত্রে তাদের এক থাকা ঈমানী দায়িত্ব ছিল।
আরও পড়ুন: জ্বালানির দাম বাড়াল চীন
কারণ ইহুদীবাদী ইসরাইল-আমেরিকার যৌথ শক্তি ফিলিস্তিন, লেবানন, সিরিয়া, লিবিয়া, ইরাক, আফগানিস্তানের মতো মুসলিম রাষ্ট্রকে একের পর এক যখন ধ্বংস করছিল তখন মধ্যপ্রাচ্যে থাকা মুসলিম নামধারী সৌদি আরব থেকে শুরু করে সকল মুসলিম রাষ্ট্রগুলোই তাদের রাষ্ট্রগুলোকে ব্যবহার করতে দিয়েছে কিংবা এসব হামলায় কোন প্রতিবাদ করেনি, সব সময় নিজেদের ক্ষমতা ও অর্থের লোভে চুপ থেকেছিল। এসব দেখেই পাকিস্তানকে অন্তত সারা বিশ্বের মুসলমানদের পালস বোঝা এই মুহূর্তে অত্যন্ত জরুরী।
মধ্যপ্রাচ্যের নামধারী মুসলিম রাষ্ট্রগুলোর উচিত ছিল - ফিলিস্তিন, লেবানন, সিরিয়া, ইরাক, ইরান কিংবা আফগানিস্তানের মতো মুসলিম রাষ্ট্রে পশ্চিমা ইহুদিবাদী রাষ্ট্রের হামলা কিংবা দীর্ঘদিন থেকে ফিলিস্তিনে যে গণহত্যা চলছে , লেবাননে যে হত্যাযজ্ঞ চলছে, কাশ্মীরের মুসলমানদের বিরুদ্ধে যে অন্যায় অত্যাচার চলছে সেগুলোর বিরুদ্ধে যুদ্ধ না করতে পারলেও অন্তত তাদের নিন্দা জানানো কিংবা বিরোধিতা করা। কিন্তু তারা তো সেটা করেইনি বরং উল্টো এই রাষ্ট্রগুলোকে ধ্বংসের জন্য পশ্চিমা ইহুদীবাদী কিংবা জায়নবাদী শক্তিকে ইন্ধন দিয়েছে, নিজেদের ঘাঁটি, নিজেদের মাটি ব্যবহার করতে দিয়েছে এবং এখনো দিচ্ছে তার আরেক মুসলমান ভাইকে হত্যা করার জন্য।
সুতরাং এসব দেখে পাকিস্তান যদি পরমাণু শক্তিধর রাষ্ট্র হওয়ায় নিজের ভবিষ্যৎ এবং মুসলিম বিশ্বের ভবিষ্যৎ চিন্তা না করে সাম্প্রতিক সৌদি আরবের সাথে সামরিক জোটে যাওয়ার কারণে কিংবা মধ্যপ্রাচ্যের ওইসব রাষ্ট্রের মত রাষ্ট্রক্ষমতা এবং অর্থের লোভে পড়ে ইহুদীবাদী পশ্চিমা শক্তির দাসত্ব করার জন্য সৌদির পক্ষ হয়ে ইরানের বিরুদ্ধে হামলার প্রস্তুতি নেয় তবে তাদেরকে এটাও মনে রাখা উচিত তারাও ওইসব মুসলিম রাষ্ট্রের মত সারা বিশ্বের মুসলিমদের কাছে গাদ্দার রাষ্ট্র হিসেবে পরিচিতি পাবে। নামে গাদ্দার হলেও চলতো, কিন্তু এর মাধ্যমে তারা আরো ভয়ংকর পশ্চিমা শক্তির পাতা ফাঁদে পা দিচ্ছে এটা বিশ্লেষণ করা উচিত। কারণ বিশ্বের একমাত্র মুসলিম রাষ্ট্র যে পরমাণু শক্তিধর রাষ্ট্র হিসেবে আর শক্তিশালী থাকতে পারবে না, এমন ব্যবস্থা করাই পশ্চিমা বিশ্বের একটি লক্ষ্য - সেটিও পাকিস্তানকে ইরানের বিরুদ্ধে হামলা পরিচালনার আগে কিংবা এমন চিন্তা করার আগে অনুধাবন করতে হবে।
বিশেষ করে পাকিস্তানকে আরো অনুধাবন করা উচিত, পশ্চিমা বিশ্বকে খুশি করতে মধ্যপ্রাচ্যের রাষ্ট্র গুলোর মত সৌদি জোটে থাকার কারণে ইরানের বিরুদ্ধে হামলা কিংবা এমন চিন্তা করলে সব থেকে বেশি খুশি হবে প্রতিবেশী শত্রু রাষ্ট্র ভারত এবং ইসরাইল। কারণ তাদেরকে আর নিজে থেকে এই পরমাণু শক্তিধর রাষ্ট্রের মোকাবেলা কিংবা পাকিস্তানের সামরিক শক্তি ধ্বংসের জন্য তাদের যুদ্ধ করার প্রয়োজন হবে না। যারা নিজেরাই অপর মুসলিম রাষ্ট্র ইরানের বিরুদ্ধে আরেক মুসলিম নামধারী পশ্চিমাদের সহায়ক সৌদি আরবের পক্ষ হয়ে ইরানের বিরুদ্ধে হামলার সম্ভাবনার কথা ভাবছে।
আরও পড়ুন: শিশু-তরুণ হত্যার দায়ে শেখ হাসিনার ক্ষমা নেই: রিজভী
সুতরাং এটি ভারত, ইজরায়েল এবং পশ্চিমা বিশ্বের জন্য পাকিস্তান ধ্বংসের দীর্ঘদিনের প্রত্যাশিত ফল হিসেবে তাদের জন্য সাপে বর হবে, কিংবা মেঘ না চাইতেই বৃষ্টির মতো হবে। সেই সাথে ইরানের বিরুদ্ধে সৌদি জোটে যাওয়ার কারণে পাকিস্তান যদি কোন কারণে মধ্যপ্রাচ্যের এই যুদ্ধে শামিল হয় তাহলে রাষ্ট্রটি মধ্যপ্রাচ্যের রাষ্ট্র গুলোর মত মুসলিম বিশ্বের কাছে গাদ্দার হবার পাশাপাশি নিজের সামরিক শক্তির দিক থেকেও নিজেদেরকে মারাত্মক ঝুঁকিতে ও ধ্বংসের মুখে ফেলবে এমন আশঙ্কা করা আজকের দিনে অমূলক নয়।
লেখকঃ সাংবাদিক, রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও কলামিস্ট।
তালাশ বিডি/মিডিয়া লিঃ
সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন