০৭:০৫ পি.এম
বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান জাতীয় সংসদের দক্ষিণ প্লাজায় যুক্তরাষ্ট্রের স্বাধীনতার ২৫০তম বার্ষিকী উদযাপন অনুষ্ঠানে যুক্তরাষ্ট্রকে বাংলাদেশের ‘পরীক্ষিত বন্ধু’ হিসেবে অভিহিত করেছেন। এর কারণে একটি পুরোনো বিতর্ক আবারো সামনে এসেছে।
কূটনৈতিক সৌজন্য আন্তর্জাতিক সম্পর্কের অবিচ্ছেদ্য অংশ, এবং দুই দেশের বন্ধুত্ব উদযাপনেও অস্বাভাবিক কিছু নেই। কিন্তু ১৯৭১ সালের সেই চূড়ান্ত সময়ের অবিস্মরণীয় কথা উল্লেখ না করে যুক্তরাষ্ট্রকে ‘পরীক্ষিত বন্ধু’ হিসেবে তুলে ধরা ইতিহাসকে রাজনীতি সুবিধার জন্য সুবিধামতো ব্যাখ্যা করার ঝুঁকি তৈরি করে।
আরও পড়ুন: কৃষি ও জলবায়ু পরিবর্তনের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় বাকৃবিতে আন্তর্জাতিক প্রকল্পের উদ্বোধন
মন্তব্যটি এসেছে এমন একটি দলের নেতার কাছ থেকে, যাদের মুক্তিযুদ্ধকালীন ভূমিকা নিয়ে বিতর্ক আজও দলটির রাজনৈতিক পরিচয়ের সঙ্গে জড়িয়ে আছে। এ জন্য এই বিষয়টি এড়িয়ে যাওয়া কঠিন। যখন জামায়াতে ইসলামী স্থায়ী বন্ধুত্বের ভাষা ব্যবহার করে, অথচ মুক্তিযুদ্ধের সময় নিজেদের এবং ওয়াশিংটনের ভূমিকা- উভয় বিষয়েই নীরব থাকে, তখন তা ইতিহাসের প্রতি ধারাবাহিকতা ও সামঞ্জস্য নিয়ে অস্বস্তিকর প্রশ্ন উত্থাপন করে।
তবে এই আয়োজনটি নিয়ে বামপন্থী রাজনৈতিক দল এবং বুদ্ধিজীবী মহল সমালোচনা করেছেন। তারা করেছেন মন্তব্য যে, দেশের সংসদ ভবন প্রাঙ্গণে এমন একটি আয়োজন বাংলাদেশের ইতিহাসের একটি বেদনাদায়ক অধ্যায়কে উপেক্ষা করেছে। তারা এই ঘটনাকে ‘যুক্তরাষ্ট্রের ক্রমবর্ধমান প্রভাব’ নিয়ে বৃহত্তর উদ্বেগের সঙ্গে যুক্ত করেন।
একই প্রেক্ষাপটে তারা যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে অন্তর্বর্তী সরকারের করা বাণিজ্য চুক্তিরও সমালোচনা করেন। তাদের বক্তব্য, এটি বাংলাদেশের সার্বভৌম স্বার্থের পরিপন্থী। এসব সমালোচনার সঙ্গে কেউ একমত হোন বা না হোন, এগুলো এমন একটি ঐতিহাসিক দগদগে স্মৃতিকে আবারও সামনে আনে যা জাতিগত চেতনায় গভীরভাবে গেঁথে আছে।
ইতিহাসবিদদের অনেকেই মুক্তিযুদ্ধের সময়ে নিক্সন প্রশাসনের নীতিকে যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রনীতির সবচেয়ে বড় নৈতিক ব্যর্থতাগুলোর একটি হিসেবে বিবেচনা করেন। স্নায়ুযুদ্ধের কৌশলগত দিক এবং চীনের সঙ্গে সম্পর্ক স্থাপনের লক্ষ্যকে অগ্রাধিকার দিয়ে তৎকালীন মার্কিন প্রেসিডেন্ট রিচার্ড নিক্সন ও তার জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা হেনরি কিসিঞ্জার বাংলাদেশে (তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান) পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর ব্যাপক নৃশংসতার স্পষ্ট প্রমাণ থাকা সত্ত্বেও পাকিস্তানকে রাজনৈতিক ও সামরিক সমর্থন দিয়ে যেতে থাকেন।
আরও পড়ুন: ঢাকার বড় চ্যালেঞ্জ যানজট ও রাস্তায় হকারের অব্যবস্থাপনা: ডিএসসিসি প্রশাসক
যুক্তরাষ্ট্রের সরকারব্যবস্থার ভেতর থেকেই এর বিরুদ্ধে তীব্র বিরোধিতা ছিল, যা এই ঘটনাকে আরও তাৎপর্যপূর্ণ করে তোলে। ঢাকায় নিযুক্ত তৎকালীন মার্কিন কনসাল জেনারেল আর্চার ব্লাড আমেরিকার কূটনৈতিক ইতিহাসের অন্যতম সাহসী কাজ করেন।
পরবর্তীকালে বহুল আলোচিত ‘ব্লাড টেলিগ্রাম’, যেখানে প্রায় ২০ জন মার্কিন কর্মকর্তা স্বাক্ষর করেছিলেন, সেখানে ওয়াশিংটনের পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর কর্মকাণ্ডের নিন্দা জানাতে ব্যর্থতাকে ‘নৈতিক দেউলিয়াত্ব’ হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়। কিন্তু এই অবস্থানের জন্য ব্লাডকে প্রশংসিত করার পরিবর্তে কার্যত একপাশে সরিয়ে দেওয়া হয়।
গ্যারি জে. ব্যাসের বহুল প্রশংসিত গ্রন্থ The Blood Telegram: Nixon, Kissinger, and a Forgotten Genocide কূটনৈতিক বার্তা ও প্রত্যক্ষদর্শীদের বর্ণনার ভিত্তিতে সেই সময়কার ঘটনাপ্রবাহ পুনর্গঠন করেছে।
বইটিতে উঠে এসেছে, কীভাবে ঢাকায় কর্মরত মার্কিন কূটনীতিকেরা বাঙালি বেসামরিক মানুষ, বুদ্ধিজীবী, শিক্ষার্থী এবং হিন্দু সম্প্রদায়ের ওপর সংঘটিত পরিকল্পিত নৃশংসতাকে গণহত্যা হিসেবে নথিবদ্ধ করেছিলেন। অথচ ওয়াশিংটনের নীতিনির্ধারকেরা নৈতিক নেতৃত্ব প্রদর্শনের পরিবর্তে কৌশলগত নীরবতাকেই বেছে নিয়েছিলেন।
আরও পড়ুন: ব্রিকস দেশগুলোর জন্য ‘ওপেন-সোর্স এআই জোন’ গঠনের প্রস্তাব সি চিন পিংয়ের
১৯৭১ সালের ডিসেম্বর মাসে যুক্তরাষ্ট্রের নীতির এই বৈপরীত্য আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে। ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধ যখন চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছায়, তখন যুক্তরাষ্ট্র পারমাণবিক শক্তিচালিত বিমানবাহী রণতরী ইউএসএস এন্টারপ্রাইজ-এর নেতৃত্বাধীন টাস্ক ফোর্স ৭৪-কে বঙ্গোপসাগরে পাঠায়।
যদিও অধিকাংশ ইতিহাসবিদ এই মোতায়েনকে সোভিয়েত ইউনিয়ন ও ভারতের প্রতি স্নায়ু যুদ্ধকালীন একটি কৌশলগত বার্তা হিসেবে ব্যাখ্যা করেন, বাংলাদেশে এটি ব্যাপকভাবে দেশের স্বাধীনতার জন্য লড়াইরত শক্তিগুলোকে ভয়ভীতি প্রদর্শনের প্রচেষ্টা হিসেবে দেখা হয়েছিল। সেই উপলব্ধি তখন থেকে বাংলাদেশের ঐতিহাসিক স্মৃতির অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে রয়েছে। তথাপি, ১৯৭১ সালে যুক্তরাষ্ট্রের ভূমিকাকে কেবল নিক্সন প্রশাসনের কর্মকাণ্ডের মধ্যে সীমাবদ্ধ করা যায় না।
হোয়াইট হাউস যখন পাকিস্তানের সামরিক শাসকদের পাশে দাঁড়িয়েছিল তখন অনেক আমেরিকান দৃঢ়ভাবে বাঙালি জনগণের পাশে দাঁড়িয়েছিলেন। আর্চার ব্লাড ও তার সহকর্মীরা কর্মজীবনের চেয়ে বিবেককে বেছে নিয়েছিলেন। আমেরিকান লেখক, শিল্পী ও আন্দোলনকর্মীরা তাদের নিজেদের সরকারের নীতির বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানিয়েছিলেন। অ্যালেন গিন্সবার্গ কবিতায় বাঙালি শরণার্থীদের দুর্ভোগ তুলে ধরেছিলেন। জোয়ান বায়েজ আন্তর্জাতিক প্রতিবাদে তার কণ্ঠ মিলিয়েছিলেন। জর্জ হ্যারিসন ও রবিশঙ্কর ‘কনসার্ট ফর বাংলাদেশ’-এর আয়োজন করেছিলেন। যা বিংশ শতাব্দীর অন্যতম ভয়াবহ মানবিক সংকটের প্রতি অভূতপূর্ব বৈশ্বিক মনোযোগ আকর্ষণ করে এবং শরণার্থীদের ত্রাণকার্যের জন্য বিপুল পরিমাণ তহবিল সংগ্রহ করতে সক্ষম হয়।
বাংলাদেশের বিজয়ের পর যুক্তরাষ্ট্র নিজেও তার নীতি পরিবর্তন করে। স্বাধীনতার পর ওয়াশিংটন দ্রুত নতুন রাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্ক স্থাপনে তৎপর হয়। বাংলাদেশের অন্যতম প্রধান উন্নয়ন অংশীদার হয়ে ওঠে। কয়েক মাসের মধ্যেই তারা বিপুল পরিমাণ মানবিক সহায়তা প্রদানের প্রতিশ্রুতি দেয়। ১৯৭৩ সাল নাগাদ এটি বাংলাদেশের বৃহত্তম দ্বিপাক্ষিক সাহায্যদাতা হিসেবে আবির্ভূত হয়। যা যুদ্ধবিধ্বস্ত একটি দেশের পুনর্গঠনে সহায়তা করে।
আরও পড়ুন: রোমান্টিক নাটক-সিনেমা নির্মাণ বন্ধে সেই আইনজীবীর ফের রিট
নিক্সন প্রশাসন এবং আমেরিকান জনগণের মধ্যে এই পার্থক্যটি গুরুত্বপূর্ণ। ১৯৭১ সালে মার্কিন নীতির গভীর ব্যর্থতাকে সততার সাথে স্বীকার করার পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্রের সাথে তার সমসাময়িক অংশীদারিত্বকে মূল্যায়ন করতে পারে বাংলাদেশ। একইভাবে, যুক্তরাষ্ট্রের সেইসব কূটনীতিক, বুদ্ধিজীবী, শিল্পী এবং সাধারণ নাগরিকদেরও কৃতজ্ঞতার সঙ্গে স্মরণ করা উচিত বাংলাদেশের। ঠিক এ কারণে যুক্তরাষ্ট্রকে ‘পরীক্ষিত বন্ধু’ হিসেবে বর্ণনা করার বিষয়টি সতর্ক বিবেচনার দাবি রাখে। সংকটের মুহূর্তেই বন্ধুত্বের পরীক্ষা হয়। বাংলাদেশের সর্বশ্রেষ্ঠ জাতীয় সংকটের সময়ে নিক্সন প্রশাসন সেই পরীক্ষায় ব্যর্থ। কিন্তু, অনেক আমেরিকান অসাধারণ সাহস ও মানবিকতার সাথে সেই পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়েছিলেন।
নির্বাচিত স্মৃতিচারণের মাধ্যমে ইতিহাসের কোনো উপকার হয় না। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ এই প্রজাতন্ত্রের নৈতিক ভিত্তি। যেকোনো রাজনৈতিক দলের-বিশেষ করে এমন দলের, যাদের নিজেদের যুদ্ধকালীন ভূমিকা আজও গভীরভাবে বিতর্কিত-সেই ইতিহাসকে সংশোধনবাদের পরিবর্তে বিনয়ের সাথে দেখা উচিত। বাংলাদেশ ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যকার আজকের অংশীদারিত্ব উদযাপন করা সম্পূর্ণ বৈধ। কিন্তু ঐতিহাসিক বিবরণকে নতুন করে সাজানো বৈধ নয়।
শক্তিশালী দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক কঠিন সত্যকে ভুলে যাওয়ার উপর নয়। বরং সততার সাথে তার মুখোমুখি হওয়ার উপর নির্মিত হয়। বর্তমানে বাংলাদেশ ও যুক্তরাষ্ট্র একটি পরিণত ও গঠনমূলক অংশীদারিত্ব উপভোগ করছে। এই অংশীদারিত্ব দুর্বল না হয়ে বরং আরও শক্তিশালী হবে যখন উভয় দেশই উপলব্ধি করে যে ওয়াশিংটন একসময় ইতিহাসের ভুল পক্ষে থাকলেও বহু আমেরিকান বিশ্বের বিবেককে বাঁচিয়ে রাখতে সাহায্য করেছিল।
আরও পড়ুন: এআই নিয়ন্ত্রণে আইনপ্রণেতাদের কঠোর হওয়ার আহ্বান ওবামার
তালাশ বিডি/মিডিয়া লিঃ
সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন